ইসলামী নেতৃত্ব ও ক্ষমতা

সত্যিকার মুসলিম ক্ষমতা চায় না — তিনি অন্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন

১. নিজেকে সেরা ভাবা এবং বিভেদ সৃষ্টির মানসিকতা

যে ব্যক্তি নিজেকে সেরা ভেবে সমাজ বা সংস্থায় অশান্তি ও বিভেদ তৈরি করে, সে মূলত চরম বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।

ভ্রান্ত অহংকার

কুরআন "বলুন, ‘আমি কি তোমাদেরকে আমলসমূহের দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সংবাদ দেব?’ তারা সেইসব লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনেই পণ্ড হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করে যে তারা ভালো কাজই করছে।" — সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১০৩-১০৪

ক্ষমতার লোভ ও বিভেদ সৃষ্টি

কুরআন "আর মানুষের মধ্যে এমনও কেউ আছে যার পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে মুগ্ধ করে... আর যখন সে পিঠ ফিরায়, তখন সে জমিনে অশান্তি সৃষ্টি করার এবং শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু ধ্বংস করার চেষ্টা করে। আর আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না।" — সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২০৪-২০৫

২. বিভেদ সৃষ্টিকারী এবং জোরপূর্বক নেতৃত্ব লাভকারীর শাস্তি

রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন যে, মুসলিম সমাজের ঐক্য বিনষ্ট করে কেউ যদি নিজের আধিপত্য কায়েম করতে চায়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

ঐক্য বিনষ্টকারীর শাস্তি

হাদিস রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের মাঝে শীঘ্রই অনেক বিপর্যয় আসবে। এমতাবস্থায় যখন তোমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবে, তখন যদি কেউ তোমাদের এই ঐক্য নষ্ট করতে বা তোমাদের দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে আসে, তাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করো (বা কঠোরভাবে দমন করো), সে যেই হোক না কেন।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮৫২

নেতৃত্বের অহংকার ও জাহেলিয়াতের মৃত্যু

হাদিস রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আনুগত্যের বাইরে চলে গেল এবং জামায়াত (মুসলিম সমাজ) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, অতঃপর এই অবস্থায় মারা গেল, তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের (অন্ধকার যুগের) মৃত্যু।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮৪৮

জোর করে ইমামতি বা নেতৃত্ব নেওয়া নিষিদ্ধ

হাদিস রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তিন ব্যক্তির সালাত তাদের কান অতিক্রম করে না (কবুল হয় না): পলায়নকারী দাস যতক্ষণ না সে ফিরে আসে, এমন নারী যার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে রাত কাটায়, এবং এমন নেতা বা ইমাম যাকে তার অধীনস্থ বা সমাজ অপছন্দ করে কিন্তু সে জোর করে নেতৃত্ব দেয়।" — জামে আত-তিরমিযী, হাদিস নং: ৩৬০

কুরআন ও হাদিসে নেতৃত্বের মূলনীতি

নেতৃত্ব অহংকারীদের জন্য নয়

আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, পরকালের কল্যাণ তাদের জন্য নয় যারা দুনিয়াতে জোরপূর্বক নিজের আধিপত্য বা শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করতে চায়।

কুরআন "এই পরকাল তো আমরা সেইসব লোকদের জন্য নির্ধারণ করি, যারা দুনিয়াতে উচ্চাভিলাষ (নিজের শ্রেষ্ঠত্ব) প্রকাশ করতে চায় না এবং কোনো বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। আর চূড়ান্ত শুভ পরিণাম তো কেবল মুত্তাকীদের (পরহেজগারদের) জন্য।" — সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৮৩

নেতৃত্ব আল্লাহর দান এবং মানুষের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়

প্রকৃত নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব আল্লাহ কেবল তাদেরকেই দেন যারা আমানতদার এবং যোগ্য। গায়ের জোরে এটি অর্জন করা যায় না।

কুরআন "নিশ্চয় আল্লাহ তাকে তোমাদের ওপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে জ্ঞানে ও দেহে প্রাচুর্য দান করেছেন। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নিজের রাজত্ব দান করেন।" — সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৪৭

পরামর্শের ভিত্তিতে নেতৃত্ব

শাসনভার জোরজুলুমের মাধ্যমে নয়, বরং দয়া, কোমলতা এবং পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে।

কুরআন "আল্লাহর রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রূঢ়ভাষী ও কঠোরচিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেতো।" — সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৫৯

যে ক্ষমতা চায়, সে আল্লাহর সাহায্য পায় না

রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে পদের লোভ করতে নিষেধ করেছেন। কারণ চেয়ে নেওয়া পদে আল্লাহর কোনো বরকত থাকে না।

হাদিস আব্দুর রহমান বিন সামুরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "হে আব্দুর রহমান! কখনো নেতৃত্ব চেয়ে নিও না। কারণ তুমি যদি চাওয়ার পর তা পাও, তবে তোমাকে তার ওপর (একাকী) ছেড়ে দেওয়া হবে (কোনো ঐশ্বরিক সাহায্য পাবে না)। আর যদি না চেয়েই তা পাও, তবে তোমাকে তাতে সাহায্য করা হবে।" — সহীহ বুখারী: ৭১৪৬, সহীহ মুসলিম: ১৬৫২

ক্ষমতার লোভীকে নেতৃত্ব দেওয়া হবে না

যে ব্যক্তি নিজে থেকে পদের জন্য ব্যাকুল বা লালায়িত থাকে, সে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী শুরুতেই অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

হাদিস আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আল্লাহর কসম! আমরা এমন কোনো ব্যক্তিকে এই কাজের (নেতৃত্বের) দায়িত্ব দেব না, যে নিজে তা চায় বা যে পদের প্রতি লোভ রাখে।" — সহীহ বুখারী: ২২৬১, সহীহ মুসলিম: ১৭৩৩

নেতৃত্ব পরকালে অনুশোচনার কারণ

পদের দায়িত্ব এতটাই ভারী যে, দুনিয়াতে যারা এর পেছনে ছোটে, কিয়ামতের দিন তারা চরম লজ্জিত হবে।

হাদিস রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই তোমরা নেতৃত্বের লোভ করো, অথচ কিয়ামতের দিন তা কেবলই অনুশোচনা ও লজ্জার কারণ হবে।" — সহীহ বুখারী: ৭১৪৯

জনগণের অসন্তুষ্টিতে জোর করে নেতা হওয়া নিষিদ্ধ

সমাজ বা অধীনস্থদের জোরপূর্বক নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা বা তাদের সম্মতি ছাড়া নেতৃত্ব দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

হাদিস রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তিন ব্যক্তির সালাত তাদের কান অতিক্রম করে না (কবুল হয় না): ... এবং এমন ব্যক্তি যে কোনো সম্প্রদায়ের ইমামতি বা নেতৃত্ব দেয়, অথচ তারা তাকে অপছন্দ করে।" — জামে আত-তিরমিযী: ৩৬০

অহংকারের কারণে বিভেদ সৃষ্টি করা জাহেলিয়াত

নিজের জেদ বা দলের অহংকারে মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ইসলাম পূর্ব অন্ধকার যুগের (জাহেলিয়াতের) শামিল।

হাদিস রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আনুগত্যের বাইরে চলে গেল এবং জামায়াত (মুসলিম সমাজ) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, অতঃপর এই অবস্থায় মারা গেল, তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের মৃত্যু।" — সহীহ মুসলিম: ১৮৪৮

প্রকৃত মুসলিম নেতৃত্বের পেছনে ছোটেন না — তিনি অন্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন। নিচে খলিফায়ে রাশিদীনের ইতিহাসে এর জ্বলজ্বলে প্রমাণ দেখা যায়।


হযরত আবু বকর (রা.): তিনি কি খলিফা হতে চেয়েছিলেন?

একেবারেই না।

তিনি অন্য দুজনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন

সেখানের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে হযরত আবু বকর (রা.) নিজের নাম খলিফা হিসেবে মোটেও পেশ করেননি। বরং তিনি উপস্থিত সবাইকে বলেছিলেন: "আমি তোমাদের জন্য এই দুই ব্যক্তির যেকোনো একজনকে নেতা হিসেবে পছন্দ করছি, তোমরা যার ইচ্ছা হাতে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করো।"—এই বলে তিনি হযরত উমর (রা.) এবং হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর হাত টেনে ধরেন [১.২.১, ১.২.৬]।

হযরত উমরের জোরাজুরি

হযরত উমর (রা.) তখন উত্তর দিয়েছিলেন, "হে আবু বকর! আপনার থাকতে আমাদের কারো খলিফা হওয়া সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের অসুস্থতার সময় আপনাকে নামাজের ইমামতি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাই দ্বীনের বিষয়ে নবীজি যাকে পছন্দ করেছেন, দুনিয়ার বিষয়েও আমরা তাকেই বেছে নিলাম।" এই বলে হযরত উমর (রা.) জোরপূর্বক আবু বকর (রা.)-এর হাত টেনে নিয়ে প্রথম বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ দেন [১.২.১, ১.২.৩]। এরপর উপস্থিত বাকি সবাই তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নেন [১.১.৩]।

খিলাফত পাওয়ার পর হযরত আবু বকরের ঐতিহাসিক ভাষণ

"হে লোকসকল! আমাকে তোমাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, অথচ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই... আমি যদি সঠিক কাজ করি তবে আমাকে সাহায্য করো, আর যদি ভুল করি তবে আমাকে সোজা করে দিও..." — সূত্র: ইবনে হিশাম, আল-সিরাহ আল-নাবাবিয়্যাহ; ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া [১.২.৮]

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) — খিলাফতের দায়িত্ব এড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা

হযরত আবু বকর (রা.) যখন তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে পরবর্তী খলিফা হিসেবে হযরত উমর (রা.)-এর নাম প্রস্তাব করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন উমর (রা.) তা শুনে চরমভাবে অস্বীকৃতি জানান।

হযরত উমরের ঐতিহাসিক উক্তি

"হে আবু বকর! আপনার এই খিলাফতের পদের কোনো প্রয়োজন আমার নেই।"

উত্তরে হযরত আবু বকর (রা.) বলেছিলেন:

"আপনার প্রয়োজন না থাকতে পারে, কিন্তু উম্মাহর স্বার্থে এই খিলাফতের পদের আপনাকে প্রয়োজন।" — ইমাম ইবনে জাওজি, তারিখ উমর ইবনুল খাত্তাব

জনগণের সাথে পরামর্শ (শুরা)

হযরত আবু বকর (রা.) কিন্তু একা এই সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি মদীনার শীর্ষস্থানীয় সাহাবী—যেমন হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ, হযরত উসমান এবং হযরত আলী (রা.)-এর সাথে গোপনে দীর্ঘ পরামর্শ করেন। তাঁরা সবাই একবাক্যে বলেন যে, উমর (রা.)-এর কঠোরতা কেবল দ্বীনের স্বার্থে এবং উম্মাহর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনিই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। সবার এই জোর দাবির মুখে উমর (রা.) শেষ পর্যন্ত উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে চুপ হয়ে যান এবং দায়িত্ব গ্রহণ করেন।


হযরত উসমান (রা.): তিনি কি খলিফা হতে চেয়েছিলেন?

না, হযরত উসমান (রা.)-ও ক্ষমতার পেছনে ছোটেননি।

হযরত উমর (রা.) যখন মৃত্যুর শয্যায় ছিলেন, তখন তিনি পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য নিজে কারো নাম না বলে ৬ জন বিশিষ্ট সাহাবীর একটি নির্বাচনী বোর্ড (শুরা) গঠন করে যান [১.১.৭]। এই বোর্ডে হযরত উসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-ও ছিলেন [১.১.৭]।

আব্দুর রহমান বিন আউফের মধ্যস্থতা

সাহাবী হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) নিজে খিলাফতের দাবি থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন এবং মদীনার মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে সাধারণ জনগণের মতামত জরিপ করেন যে তারা কাকে খলিফা হিসেবে চান [১.১.৭]।

জনগণের ইচ্ছায় নির্বাচন

দীর্ঘ তিন দিন ধরে মদীনার সাধারণ মানুষ, নারী এবং মদীনায় আসা কাফেলার লোকদের মতামত নেওয়ার পর দেখা গেল, সিংহভাগ মানুষ হযরত উসমান (রা.)-কে খলিফা হিসেবে দেখতে চায় [১.১.৭]।

হযরত উসমান (রা.) মদীনার অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে রক্তপাত এড়াতে এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের খাতিরে খিলাফতের পদ ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও ভবিষ্যৎবাণীর কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেননি।

হাদিস

হাদিস হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "হে উসমান! আল্লাহ হয়তো তোমাকে একটি জামা (নেতৃত্ব/খিলাফত) পরাবেন। এরপর মুনাফিকরা যদি তোমার থেকে সেই জামাটি খুলে নিতে চায়, তবে তুমি তাদের জন্য তা খুলে ফেলো না (পদত্যাগ করো না)।" — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১১২; জামে আত-তিরমিযী, হাদিস নং: ৩৭০৫; মুসনাদে আহমাদ

সাহাবীগণের সমর্থন

হযরত আলী (রা.): তিনি উসমান (রা.)-কে রক্ষা করতে তার নিজের দুই সন্তান—হযরত হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে তরবারি দিয়ে উসমান (রা.)-এর বাড়ির দরজায় পাহারায় পাঠান।

হযরত আয়েশা (রা.): যদিও উসমান (রা.)-এর কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সাথে তার দ্বিমত ছিল, কিন্তু তিনি কখনোই উসমান (রা.)-কে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত করা বা তাকে হত্যার পক্ষে ছিলেন না।

হযরত উসমান (রা.)-এর নিজের বক্তব্য

হযরত ইবনে উমর (রা.) যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আপনি জীবন বাঁচাতে পদত্যাগ করছেন না কেন?" তখন উসমান (রা.) উত্তর দিয়েছিলেন:

"আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারি না এবং এমন কোনো নিয়ম চালু করতে চাই না যেখানে তরবারির ভয়ে বা কোনো দলের চাপে খলিফাকে পদত্যাগ করতে হয়।" — ইবনে সাদ, আল-তাবাকাত আল-কুবরা

হযরত আলী (রা.) — উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর

উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মদীনায় চরম অরাজকতা তৈরি হয়। তখন আনসার ও মুহাজির সাহাবীগণ একত্রিত হয়ে হযরত আলী (রা.)-কে খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য চাপ দেন। আলী (রা.) প্রথমে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন,

"আমাকে খলিফা না বানিয়ে তোমরা অন্য কাউকে বানাও, আমি খলিফা হওয়ার চেয়ে পরামর্শদাতা হিসেবে থাকাকে বেশি পছন্দ করব।"

কিন্তু উম্মাহকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পরবর্তীতে তিনি সকলের বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করেন।

— ইমাম ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া

মুয়াবিয়া (রা.)-এর ঐতিহাসিক বক্তব্য

"আমি আলীর শ্রেষ্ঠত্ব এবং খিলাফতের অধিকারকে অস্বীকার করি না, আর আমি নিজের জন্য খিলাফত দাবিও করছি না। কিন্তু উসমানের হত্যাকারীরা আলীর সেনাবাহিনীর মধ্যে আশ্রয় নিয়ে আছে। আগে উসমানের হত্যাকারীদের আমাদের হাতে সোপর্দ করা হোক, তাহলে সিরিয়াবাসীদের মধ্যে আমিই প্রথম আলীর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করব।" — ইবনে হাজম, আল-ফিসাল ফিল মিলাল; ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খণ্ড

আহলে সুন্নাতের ঐতিহাসিকদের মতে, হযরত আলী (রা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত হযরত মুয়াবিয়া (রা.) কখনোই নিজেকে খলিফা বা 'আমীরুল মু'মিনীন' হিসেবে দাবি করেননি এবং আলীর আসন কেড়ে নেওয়ার কোনো ইচ্ছাও তাঁর ছিল না [১.৩.৬, ১.৩.৭]।

মুয়াবিয়া (রা.)-এর উদ্দেশ্য ক্ষমতার লোভ ছিল না, বরং তাঁর সিদ্ধান্তটি ছিল একটি 'ইজতিহাদী ভুল' (Judgmental Error) [১.২.৫]। তিনি মনে করেছিলেন, খলিফা হত্যার বিচার না করে আলীর আনুগত্য করা উসমানের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে [১.১.২, ১.১.৬]। তিনি পরিস্থিতির জটিলতা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেননি, যা হযরত আলী (রা.) খলিফা হিসেবে খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন।

সিফফিনের যুদ্ধ

তা ক্ষমতা দখলের লড়াই ছিল না, এটি ছিল মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের আদেশ বনাম একটি প্রদেশের অবাধ্যতার লড়াই।

যুদ্ধের একপর্যায়ে যখন দুই পক্ষই রক্তপাত বন্ধ করতে সালিশি বা মীমাংসা:

"এটি আলী ইবনে আবী তালিব এবং মুয়াবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ানের মধ্যকার চুক্তি...।" [১.২.৪]

এখানে হযরত আলীর নামের সাথে 'আমীরুল মু'মিনীন' বা খলিফা শব্দটি বাদ দিতে হয়েছিল মুয়াবিয়া (রা.)-এর বাহিনীর আপত্তির কারণে, কিন্তু সেখানে মুয়াবিয়া (রা.) নিজেকেও খলিফা হিসেবে দাবি করেননি [১.৩.৬]।

সত্যিকার মুসলিম ক্ষমতা চায় না — তিনি নেক আমলে নিজেকে গড়ে তোলেন এবং অন্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন। খলিফায়ে রাশিদীনের প্রতিটি উদাহরণই এর জ্বলন্ত প্রমাণ।

পরিশিষ্ট

নেক আমল ও ফজিলত — হযরত আবু বকর (রা.)-এর উদাহরণ

হাদিস তোমাদের মধ্যে আজ কে রোজা রেখেছো? আবু বকর (রাঃ) বললেন: আমি। তিনি (আবার) বললেন: তোমাদের মধ্যে আজ কে জানাজার মিছিলে গিয়েছো? আবু বকর (রাঃ) বললেন: আমি গিয়েছি। তিনি (নবী) আবার বললেন: তোমাদের মধ্যে কে অভাবীদের খাবার খাইয়েছো? আবু বকর (রাঃ) বললেন: আমি গিয়েছি। তিনি (আবার) বললেন: তোমাদের মধ্যে কে আজ অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়েছো? আবু বকর (রাঃ) বললেন: আমি গিয়েছি। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন: যার মধ্যে (এই ভালো কাজগুলো) একত্রিত হবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। — সহীহ মুসলিম ১০২৮
ইমাম নববী "এটি ফজিলতপূর্ণ আমলের বর্ণনা; উদ্দেশ্য এই নয় যে তিনি একদিনে সব করেছেন, বরং তিনি এগুলো নিয়মিত করতেন" — Sharh Sahih Muslim, Kitab al-Iman / Fadail al-Sahaba অংশ
ইবন হাজার আসকালানী "একসাথে আমলগুলো উল্লেখ করা মানে এক সময়ে সব করা নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো তার ধারাবাহিক নেকির প্রাচুর্য দেখানো" — Fath al-Bari, Kitab al-Iman / Fadail al-A‘mal discussion
ইবন রজব আল-হাম্বলী "উদ্দেশ্য হলো নেকির বিভিন্ন গুণ দেখানো; মানুষ যে কোনো সময় এগুলো করলে প্রতিটিতে সওয়াব পায়" — Jami‘ al-Ulum wal-Hikam, Hadith explanations section
আল-ক্বুরতুবী "এতে কোনো নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ নেই; বরং এটি সাধারণ সময়ের জন্য" — Al-Mufhim (Sharh Muslim)